পূর্বের অংশ পড়ুন : আমুল হুযন : মহানবীর (সাঃ) জীবনের দুঃখের বছর ।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ এর জীবনে তায়েফের ঘটনা ছিল সবচেয়ে বেদনার ও মর্মান্তিক। বিবি খাদিজা রাঃ ও চাচা আবু তালিব এর ইন্তেকালের পর আবু লাহাব বানু হাশিম গোত্রের প্রধান নিযুক্ত হন এবং হযরত মুহাম্মদ সাঃ কে তার নিরাপত্তা থেকে বের করে দেন। ফলে কুরাইশ নেতৃবৃন্দ হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর গতিবিধি অনুরণ ও ইসলামের দাওয়াত দিতে বাধা দিতে শুরু করে ।
যত দিন পর্যন্ত চাচা আবু তালিব জীবিত ছিলেন, তত দিন
কুরাইশরা হজরতকে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে সাহস পায়নি। কিন্তু তার মৃত্যুর
পর শত্রুদের অত্যাচার প্রবল আকার ধারণ করল। হজরত তবু মাতৃভূমি পরিত্যাগ করার কথা এক
মুহূর্তের জন্যও চিন্তা করেননি। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, এ বিশাল উপদ্বীপ একদিন
ইসলামের সত্যালোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। তার অন্তরে দৃঢ়প্রত্যয় ছিল যে, তার শত্রুরাই
একদিন তার অন্তরঙ্গ বন্ধু হবে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত কুরাইশদের শত্রুতায় অতিষ্ঠ হয়ে ৬২০
খ্রিস্টাব্দে হজরত (সা.) পালিত পুত্র জায়েদকে সঙ্গে নিয়ে তায়েফ গমন করলেন। মক্কা
থেকে ৬০-৭০ মাইল উত্তরে তায়েফ একটি উর্বর শস্য শ্যামলা দেশ। তায়েফের বনি সাকিফ
গোত্রের সঙ্গে মুহাম্মদ সাঃ এর মাতৃপক্ষের সম্পর্ক ছিল। তিনি ১০ দিন তায়েফ অবস্থান
করে তায়েফবাসীকে ইসলামের দাওয়াত দেন । রাসুলুল্লাহ
(স.) ভাবলেন, হয়তো তারা আল্লাহর পথে আসবে এবং ইসলামের প্রতি সমর্থন জানাবে।
তায়েফে তখন বড় বড় আমির ওমারা ও
প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের নিবাস ছিল। তাদের মধ্যে উমাইর এর বংশ ছিল গোত্রীয়
প্রধান। এরা তিন ভাই ছিল প্রসিদ্ধ। এদের নাম আব্দে ইয়ালীল, মাসউদ এবং হাবীব।
রাসুলুল্লাহ (স.) দশম নবুওয়াত বর্ষের ২৬ কিংবা ২৭ শাওয়াল জায়দ ইবনে হারেসাকে
সঙ্গে করে উক্ত তিন ভ্রাতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত
পৌঁছান।
কিন্তু তারা তা কবুল করেনি এবং অত্যন্ত
অবজ্ঞার সাথে তা প্রত্যাখ্যান করা ছাড়াও খুবই দুর্ব্যবহার করে। এ বদবখতরা এতেই
ক্ষান্ত হয়নি, তারা তায়েফের বাজারগুলোকেও উসকে দেয়, যাতে তারা হাসি-ঠাট্টা,
উপহাস, টিটকারী ইত্যাদি অসদাচারণ করে। ঐ তিন ভ্রাতা তাদের গোলাম ও
বাদিদের রাসুলুল্লাহ (স.) এর পেছনে লাগিয়ে দেয়; তারা রাসুলুল্লাহ (স.) পেছন থেকে
শোরগোল ও চিল্লাতে থাকে। শহরের দুষ্ট প্রকৃতির লোকেরা চতুর্দিক থেকে তাকে
ঘিরে ফেলে।
দুষ্টু লোকদের সমাবেশ দুইদিকে কাতার
বন্দি হয়ে দাঁড়িয়ে যায় এবং রাসুলুল্লাহ (স.) যখন রাস্তা অতিক্রম করতেন, তখন তার
পবিত্র পদ লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করতে থাকে, তাতে তার জুতো পর্যন্ত রক্তাক্ত হয়ে
যায়। যখন তিনি ক্ষত-বিক্ষত হয়ে বসে যেতেন, তখন পাষান্ডরা তার বাহু ধরে দাঁড় করিয়ে
দিতো, তিনি চলতে আরম্ভ করলে আবার পাথর নিক্ষেপ করতো এবং অশ্রাব্য গালিগালাজ করতো
এবং হাতে তালি বাজাতো। রক্তাক্ত ও সংজ্ঞাহীন নবী সাঃ কে যায়েদ কোন ক্রমে রক্ষা
করেন। করুণা ও ক্ষমার মূর্তপ্রতিক মহানবী সাঃ রক্তধারা মুছে ফেলে প্রার্থনা করেন,
“ হে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করুন। তারা জানেনা কি করলো !!
তায়েফবাসীদের বর্বরতা ও পৈশাচিকতার কবল
থেকে আশাহত হয়ে হযরত মুহাম্মদ সাঃ ফেরার পথে কোরাইশের নেতা উতবার বাগানে গিয়ে
আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। তখন দুষ্টু লোকদের সমাবেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বাগানের মালিক
ছিল উতবা ইবনে রাবীআ। তিনি কোফর অবস্থায় থাকলেও অত্যন্ত শরীফ ও নেক ছিলেন। তিনি রাসুলুল্লাহ
(স) কে করুণ অবস্থায় দেখে আদ্দাস নামক তার গোলামকে আঙ্গুরের কিছু গুচ্ছ দিয়ে রাসুলুল্লাহ
(স.)-এর নিকট পাঠান। মহানবী সাঃ এখানে আঙ্গুরগুলো ভক্ষণ করেন এবং মহান আল্লাহর
কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। এটিই ইতিহাসে তায়েফের প্রার্থনা নামে পরিচিত।
আদ্দাস ছিল খ্রিস্টান। সে মহানবী সাঃ
এর কথা-বার্তা ও ইসলামের সত্যতার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে মুসলমান হয়ে যায় । এবং মুহাম্মদ (স.)-এর মস্তক
মোবারক ও হস্ত মোবারক চুম্বন করে। উতবা জিজ্ঞাসা করে, তুমি কেন তার সাথে এমন আচরণ
করলে? কেন তুমি নিজ ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করলে? আদ্দাস বলল, বর্তমান দুনিয়ায়
তার চেয়ে উত্তম কোনো লোক নেই, তোমরা তার শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে অবগত নও, তিনি
আল্লাহর নবী। মহানবী সাঃ এর তায়েফ সফরের
প্রথম পর্ব এভাবেই শেষ হয়।
এভাবে প্রতি বছর কাবায় ইয়াসরিব থেকে দলে দলে লোক আসত। এ
রূপে অনেকেই মহানবী সাঃ এর সংস্পর্শে এসে ইসলাম গ্রহণ করতে লাগল। তাছাড়া বিপদসংকুল
তায়েফ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর মহান আল্লাহ তার হাবিব রাসূল সাঃ কে সান্তনা দেওয়ার
জন্য তার সান্নিধ্যে নিয়ে যান। যা ইতিহাসে মেরাজ গমন নামে পরিচিত।
পরবর্তী অংশ পড়ুন : মহানবীর (স.) বিস্ময়কর যাত্রা মেরাজ গমন ।
তথ্যের উৎস সমূহ:
২. ইসলামের ইতিহাস - মোঃ মাহমুদুল হাছান
৩. ইসলামের ইতিহাস ডঃ সৈয়দ মাহমুদুল হক ।
0 মন্তব্যসমূহ