মহানবীর (স.) মেরাজ যাত্র এবং সালাত ফরজ হওয়ার ঘটনা |

                             

পূর্বের অংশ পড়ুন : মহানবীর (স.) এর বিপদসংকুল তায়েফ গমন।

মহানবী সা. ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে গিয়ে একদিকে যখন লাঞ্ছনা ও গঞ্জনার তীব্র দাহনে উৎপীড়িত হচ্ছিলেন, অন্যদিকে তার আশ্রয়দাতা আবু তালেব ও জীবনসঙ্গিনী হযরত খাদিজা রা. ইহধাম ত্যাগ করেন। আবার তায়েফে ইসলাম প্রচার করতে গিয়েও তায়েফবাসীর অত্যাচারে অত্যাচারিত হয়ে বিফল মনোরথ হন। এ সময় তিনি দারুণ মর্মব্যথায় ভুগেন। এমনি সময়ে মহান আল্লাহ তাঁর বন্ধু হযরত মুহাম্মদ সা.কে নিজ সান্নিধ্যে ডেকে আশ্বাসবাণী দিয়ে সান্তনা দেন। কেননা বিপদ মুহূর্তে বন্ধুর সামান্য সাহচর্যদান দুঃখকে হালকা করে দেয়।

মেরাজ প্রিয়নবী মুহাম্মদ সা.-এর জীবনের একটি বিস্ময়কর ঘটনা। এটি মূলতঃ একটি মুজিযা। সকল নবীই মুজিযা প্রদর্শন করেছেন। তাতে বিশ্বাসী এবং অবিশ্বাসীদের হেদায়াতের নির্দেশ ঘটেছে। মেরাজ আরবি শব্দ। এর শব্দমূল ‘উরুজ’ অর্থ উত্থান। সাধারণ অর্থে ঊর্ধ্বারোহণ বা সিঁড়ি। ইসলামি পরিভাষায় নবী করীম সা.-এর সশরীরে মক্কা হতে বায়তুল মোকাদ্দাস হয়ে আরশে আজিমে দীদারে ইলাহী শেষে পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তনকে মেরাজ বলে।

মেরাজ সম্পর্কে মহাগ্রন্থা আল কুরেআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন “তিনি পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা, যিনি স্বীয় বান্দাহকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত; যার চার দিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি, যাতে আমি তাঁকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই, তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা (সূরা বনি ইসরাঈল-১)।

৬২০ সালের ২৭ রজব মহানবী সা. কাবা শরিফের ‘হাতীম’ নামক স্থানে বা অন্য বর্ণনামতে কাবার অতি সন্নিকটে অবস্থিত উম্মে হানীর রা. ঘরে শায়িত ছিলেন। এ সময় হযরত জিব্রাইল আ., হযরত মিকাইল আ. ও হযরত ইসরাফিল আ. এসে নবীকে জাগ্রত করলেন ও বক্ষ-বিদারণ করে কলব জমজমের পানিতে ধুয়ে তা’ ঈমান ও হেকমত দ্বারা পরিপূর্ণ করে যথাস্থানে প্রতিস্থাপন করে দিলেন। এ বক্ষ-বিদারণ করার সময় মহানবী সা. কোনো রকম ব্যথা অনুভব করেননি এবং কোনো রক্তপাতও হয়নি।

মহানবীর বক্ষ-বিদারণের পর তার সামনে ‘বোরাক’ নামের এক আশ্চর্য স্বর্গীয় বাহন উপস্থিত করা হয়। তাতে জিন ও লাগাম লাগানো ছিলো। এ বাহনটি গাধা হতে উঁচু এবং খচ্চর হতে নিচু। তার গতি অকল্পনীয় দ্রæত। তা’ নিজ দৃষ্টির সীমানায় পদক্ষেপ করে থাকে। যেমন এক কদমে পৃথিবী থেকে প্রথম আসমান বা নিম্নতম আসমানে পৌঁছে যায়। পলকের মধ্যে এ জাতীয় ভ্রমণ কাজ সম্পন্ন হয়। এ বাহনে আরোহণ করে তিনি বায়তুল মুকাদ্দাস পৌঁছেন।

এখানে তিনি বোরাক অদূরে বেঁধে রেখে মসজিদে প্রবেশ করে দু’ রাকাত ‘তাহিয়্যাতুল মসজিদ’ নামাজ আদায় করেন। অতঃপর বিশেষ সিঁড়ি বেয়ে প্রথম আসমানে ওঠে হযরত আদম. আ.-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। এভাবে যথাক্রমে দ্বিতীয় হতে সপ্তম আসমানে হযরত ইয়াহইয়া ও ঈসা আ., হযরত ইউসুফ আ., হযরত ইদ্রিস আ., হযরত হারুন আ., হযরত মূসা আ. এবং হযরত ইব্রাহীম আ.-এর সাথে সাক্ষাৎ হয়। সকলেই মহানবী সা.কে ‘মারহাবা’ বলে সম্বর্ধনা জানান।

সপ্তম আকাশে নবীজী বায়তুল মামুর দেখতে পান। এ বায়তুল মামুরে দৈনিক সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করে এবং কেয়ামত পর্যন্ত তারা (অর্থাৎ যারা একবার প্রবেশ করে) পুনরায় প্রবেশ করার পালা আসবে না। অতঃপর নবীজী ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ বা শেষ সীমা নির্দেশক কেন্দ্রবিন্দুতে গিয়ে পৌঁছেন। ক্রমান্বয়ে তিনি জান্নাত ও দোজখ পরিদর্শন করেন। সিদরাতুল মুনতাহায় গিয়ে বোরাকের গতি থেমে যায়। ফেরেশতা জিব্রাঈল আ.ও আর এগুতে পারলেন না। সিদরাতুল মুনতাহার নিকটেই সবুজ রংয়ের ‘রফরফ’ নামের একটি কুদরতি পাল্কী জাতীয় যানবাহন অপেক্ষমাণ ছিলো। 

এতে চড়ে একাই মহানবী সা. আল্লাহ্র সান্নিধ্যে উপস্থিত হন। মহান আল্লাহর সাথে সাক্ষাত শেষে এ সময়ই উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হওয়ার বিধান সাব্যস্ত হয়। ফেরৎ পথে মুসা আ.-এর সাথে সাক্ষাৎ হলে তার পরামর্শে তিনি মহান আল্লাহর দরবারে ফিরে গিয়ে তা’ কমাবার জন্য সুপারিশ করার পর দশ দশ করে কমতে কমে শেষে পাঁচ ওয়াক্ত এসে দাঁড়ায়। মহান আল্লাহ এতে সন্তুষ্ট হয়ে পাঁচ ওয়াক্তে পঞ্চাশ ওয়াক্তের সওয়াবদানে ওয়াদাবদ্ধ হন। উল্লেখ্য, এই সময় থেকে মুসলমানদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ হয়।

অতঃপর আসমানে যে সব নবীর সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিলো, মহানবী সা. তাদের সহকারে বায়তুল মুকাদ্দাসে ফিরে আসেন। তারা তাকে বিদায় সম্বর্ধনা জানাবার জন্য এখান পর্যন্ত আগমন করেন। ইতোমধ্যে নামাজের সময় হয়ে গেলে তিনি নবীদের ইমাম হয়ে নামাজ সম্পন্ন করেন। অতঃপর তিনি বোরাকে চড়েই রওয়ানা হন এবং অন্ধকার থাকতেই যথাস্থানে ফিরে আসেন তিনি ফিরে এসে দেখতে পান- তার অজুর পানি তখনো গড়াচ্ছে এবং বিছানা উষ্ণই ছিলো। অর্থাৎ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিশাল ভ্রমণ তথা মেরাজ সফল সমাপ্ত হয়।

এই মেরাজের প্রতি সকল মুসলিম তথা মানুষের বিশ্বাস আছে। তবে বিতর্ক সৃষ্টি হয় এত স্বল্প সময়ে এ ব্যাপক ভ্রমণ ও বহুবিধ ঘটনাবলির সংঘটন সংক্রান্ত ব্যাখ্যা ও যুক্তি নিয়ে। কিছু দুর্বলমনা ঈমানদার ও অবিশ্বাসী অমুসলিমদের কাছে এটা রহস্য হয়ে তাদের মনকে অনেক সময় তোলপাড় করে তোলে। তবে খাঁটি ঈমানদার বিশ্বাসীদের দৃষ্টিতে অবশ্য এটা অত্যন্ত সহজ ছিলো। কেননা তারা বিশ্বাস করে- হযরত সা. জীবনে মিথ্যা বলেননি। ‘আল আমিন’ ছিলো তাঁর উপাধি। তাছাড়া সব কথাই যেখানে তার সত্য বলে প্রমাণিত, যেখানে মহাগ্রন্থ আল কুরআনে এই বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা রয়েছ, সেখানে মেরাজের ঘটনা অসত্য হবে কেন?

পরবর্তী অংশ পড়ুন :আকাবার শপথ : মদীনা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তিপ্রস্তর

তথ্যের উৎস সমূহ:

১. আরব জাতির ইতিহাস - শেখ মুহাম্মদ লুৎফর রহমান ।
২. ইসলামের ইতিহাস - মোঃ মাহমুদুল হাছান 
৩. ইসলামের ইতিহাস  ডঃ সৈয়দ মাহমুদুল হক ।
৪. বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ব্লগের পোস্ট ।

                               

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ