পূর্বের অংশ পড়ুন : মহানবীর (স.) বিস্ময়কর যাত্রা মেরাজ গমন ।
৬১০ খ্রিস্টাব্দে নবুওয়্যাত প্রাপ্তির পর দীর্ঘ তেরো বছর পর্যন্ত রাসূল (সা.) মক্কাতে অবস্থান করেই আল্লাহর বাণী প্রচার করেন। প্রথম তিন বছর গোপনে গোপনে নিজের আত্মীয়-স্বজন ও কাছের মানুষজনের কাছে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করলেও পরবর্তীতে প্রকাশ্যে মক্কার সর্বসাধারণের কাছে তিনি তার উপর প্রেরিত দ্বীনের প্রতি আহবান জানান।
ইসলামের
আহবান জানানোর সাথে সাথে এতদিনের সবার প্রিয়ভাজন আল-আমীন মুহাম্মদ (সা.) পরিণত
হলেন মক্কার এক বিপজ্জনক ব্যক্তিত্বে। মক্কার স্বার্থবাদী নেতারা তাদের ক্ষমতার
জন্য রাসূল (সা.) এর নবুওয়াতী মিশনকে হুমকি হিসেবে গণ্য করেছিলো। তাদের ক্ষমতা
বজায় রাখার জন্য তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল (সা.) উপর অবতীর্ণ বাণীর প্রচারকে
বন্ধ করে দেওয়ার জন্য সকল প্রকার চেষ্টা চালায়।
মক্কায়
রাসূল (সা.) এর সাহচর্যে যাওয়াও বিপজ্জনক হয়ে পড়ে। এই সময় শুধু সে সকল সাহসী
সত্যপ্রিয় মানুষই রাসূল (সা.) এর পাশে দাঁড়িয়ে সকল প্রকার প্রতিকূলতা মোকাবেলার
জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন, যারা সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের জীবনকে বাজী রেখেছিলেন।
মক্কার
নেতৃত্বের প্রচন্ড বাধায় রাসূল (সা.) মক্কায় ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি।
মক্কায় দীর্ঘ তেরো বছর পর্যন্ত তিনি দ্বীনের প্রচারই করে গেছেন। তার এই প্রচারের
মধ্য দিয়ে একজন দুইজন করে ধীরে ধীরে ইসলামের অমীয় বাণীর আলোয় নিজেদের জীবনকে গড়ে
তুলছিলো।
মক্কার
ক্ষমতালিপ্সু নেতৃত্ব যতই বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলো, সকল বাধাকে পরিহার করে
ইসলাম মক্কার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। আরবের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ এই ধর্ম সম্পর্কে
কৌতূহলী হয়ে উঠে এবং এ সম্পর্কে খোঁজখবর করা শুরু করে। এদের মধ্যে অনেক সত্যপ্রিয়
বিবেকবান মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে।
নবুওয়াতের
একাদশ বছর অর্থাৎ ৬২০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে হজ্জ্বের মওসুমে রাসূল (সা.) এর
কাছে এরূপ ছয়জন লোক তৎকালীন ইয়াসরিব তথা মদীনা থেকে সাক্ষাত করতে আসে। ইয়াসরিবে
তখন বনু খাজরাজ ও বনু আউস এই দুই আরব গোত্রের বসবাস ছিল। এই দুইটি গোত্রের মধ্যে
প্রায়ই লড়াই লেগে থাকতো। বছরের পর বছর অব্যাহত লড়াইয়ে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো।
নিজেদের মধ্যকার এই লড়াই সমাপ্ত করার জন্য তারা একজন মধ্যস্থতাকারীর সন্ধানে ছিল।
পাশাপাশি
বনু কুরাইজা, বনু কায়নুকা ও বনু নাযীর, এই তিনটি ইহুদি গোত্রও ইয়াসরিবে বসবাস
করতো। আসমানী কিতাবধারী এই ইহুদি গোত্রসমূহের কাছ থেকে বনু আউস ও বনু খাজরাজের
লোকেরা সবসময়ই শেষ একজন নবীর আগমনের কথা শুনতো। মক্কায় রাসূল (সা.) এর নবুওয়াতের
কথা শুনে খাজরাজ গোত্রের ছয়জন ব্যক্তি কৌতূহলবশত রাসূল (সা.) এর সাথে সাক্ষাৎ করতে
আসেন। রাসূল (সা.) তাদেরকে ইসলামের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করলে তারা চিন্তা করলেন,
ইনিই হয়তো সেই নবী যার আগমনের কথা ইহুদিরা বলে থাকে। তারা তখন রাসূল (সা.) উপর
ঈমান এনে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মদীনায় ফিরে নতুন ধর্মের প্রচার শুরু করেন।
পরবর্তী
বছর নবুওয়াতের দ্বাদশ বছরে হজ্জ্বের সময় ইয়াসরিব থেকে মোট বারো জন লোক রাসূল (সা.)
এর সাথে সাক্ষাত করেন। তারা মক্কা থেকে কিছু দূরে মীনার কাছাকাছি আকাবার নিকটে
সাক্ষাত করেন। ইসলাম গ্রহনের পাশাপাশি তারা রাসূল (সা.) এর কাছে ছয়টি বিষয়ের উপর
শপথ গ্রহণ করেন। তা হলো:
(১)
আমরা একমাত্র আল্লাহর উপাসনা করব।
(২)
আমরা ব্যভিচারে লিপ্ত হব না।
(৩)
আমরা চুরি-ডাকাতি বা কোনোরূপ পরসম্পত্তি আত্মসাৎ করব না।
(৪)
আমরা সন্তান হত্যা বা বলিদান করব না।
(৫)
কারও প্রতি মিথ্যা অপবাদ বা দোষারোপ করব না।
(৬)
প্রত্যেক সৎকাজে আল্লাহর রসুল (সল্লল্লাহু আলাই্হি ওয়াসাল্লাম)-কে মেনে চলব এবং
কোনো ন্যায় কাজে তার অবাধ্য হব না।
এই
শপথটিই আকাবার প্রথম শপথ নামে পরিচিত। হজ্জ্ব শেষ হওয়ার পর এই দলটি ইয়াসরিবে ফিরে
যায়। রাসূল (সা.) তাদের সাথে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য একজন
শিক্ষক প্রেরণ করেন। হযরত মুসয়াব ইবনে উমায়ের (রা.) মদীনায় মুসলমানদের সহায়তায় তার
দাওয়াতী অভিযানে সফলতা অর্জন করেন। এমনকি উভয় গোত্রের গোত্রপতিরাও ইসলাম গ্রহণ
করে। এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে আরবের বুকে ইসলামের জন্য একটি ভূখন্ড প্রস্তুত হয়।
এর
পরবর্তী বছর নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বর্ষে অর্থাৎ ৬২২ খ্রিস্টাব্দের জুনে হজ্জ্বের সময়ে
ইয়াসরিবের উভয় গোত্রের ৭০জন মুসলমান রাসূল (সা.) এর কাছে আকাবায় সাক্ষাত করেন।
তাদের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তারা রাসূল (সা.) কে গ্রহণ করেন
এবং রাসূল (সা.) কে তাদের সাথে ইয়াসরিবে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।
এসময়
রাসূল (সা.) এর উপর আসা সকল বিপদে আপদে তারা তাকে রক্ষার জন্য শপথ করেন। এটিই
আকাবার দ্বিতীয় শপথ নামে পরিচিত। এর মাধ্যমেই মক্কা থেকে দীর্ঘ তেরো বছরের ইসলামের
প্রচারকেন্দ্র ইয়াসরিবে স্থানান্তরিত হয়। আকাবার দ্বিতীয় শপথের অল্প কিছুদিন পরেই রাসূল
(সা.) ইয়াসরিবে হিযরত করেন। তখন থেকেই ইয়াসরিব পরিচিত হয় মদীনাতুন নবী (নবীর শহর)
বা সংক্ষেপে মদীনা নামে।
মদীনাতেই
রাসূল (সা.) আল্লাহর দ্বীনকে পূর্নাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠার সুযোগ পান। মদীনাতেই প্রথম
ইসলামের আলোকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনকে গঠনের প্রয়াস পাওয়া যায়। অতএব বলা যায়,
আকাবার শপথসমূহ মূলত মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্রগঠনের প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে কাজ
করেছে। আকাবার শপথের মধ্যে দিয়ে মদীনায় প্রথমবারের মত জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে
রাসূল (সা.) এর উপর প্রেরিত আল্লাহর বাণীর বাস্তবায়নের পথ সুগম হয়।
পরবর্তী অংশ পড়ুন : মহানবীর (স.) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত ।
তথ্যের উৎস সমূহ:
২. ইসলামের ইতিহাস - মোঃ মাহমুদুল হাছান
৩. ইসলামের ইতিহাস ডঃ সৈয়দ মাহমুদুল হক ।
0 মন্তব্যসমূহ